সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মুসলিমরা কেন জঙ্গী বাদী ?

মুসলিমরা কেন জঙ্গীবাদী ? পৃথিবীর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা ইসলাম। নৈতিক মূল্যবোধের পাশাপাশি এর অর্থব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি—সবই কল্যাণধর্মী। আদর্শিক কারণেই ইসলাম আজ শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ শান্তিকামী মানুষের মিছিল নীরবে ছুটছে ইসলামের দিকে। বহু বাধা-বিপত্তির কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে বিগত এক যুগে প্রায় এক লাখ নেপালি হিন্দু ও বৌদ্ধ পূর্বপুরুষের ধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাদের কাছে ইসলাম এক বিপুল সম্ভাবনার নাম। পশ্চিমা সংস্কৃতি আদর্শিক লড়াইয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে পারছে না। তাই ইসলামের প্রতি মানুষকে বিষিয়ে তুলতে মুসলমানদের দেওয়া হয় ‘জঙ্গি’ তকমা। মুসলমানদের স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো আজ ষড়যন্ত্রের শিকার। ইহুদিরা ব্রিটেনের মদদে ফিলিস্তিনের জায়গা দখল করে স্বাধীন ফিলিস্তিনের মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশের মালিক হয়ে যায়। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে বিষয়টি সুরাহা করতে ‘এগিয়ে আসে’ প্রতিষ্ঠানটি। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ফিলিস্তিনের অর্ধেকেরও বেশি ভূমি দখল করে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। রাতারাতি ইসরায়েলকে তারা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু যে স্বাধীন রাষ্ট্রের জায়গা দখল করে ইসরায়েল নামক বিষফোড়ার জন্ম হয়, সে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি আজও দেয়নি জাতিসংঘ। ইসরায়েলিদের ট্যাংক বা কামানের বিপরীতে শান্তিকামী ফিলিস্তিনিরা যখনই আত্মরক্ষার জন্য ইট-পাটকেল হাতে নিয়েছে, তখন ইহুদি নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়া ট্যাংক বা কামানের দিকে তাদের ক্যামেরাটি না ধরে ট্যাংকের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া লোকটির ছবি তুলে পৃথিবীবাসীকে দেখিয়েছে, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিরাই ‘মস্তবড় জঙ্গি’। আর জঙ্গিদের নিধনে তো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ‘আপসহীন’। তাই ফিলিস্তিনিদের নিধনও ‘বৈধ’। অবশেষে জঙ্গি তকমায় ঢাকা পড়ে যায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার অধিকার প্রসঙ্গ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভূসর্গ হয়েও দখলদারের আক্রমণে আক্রান্ত কাশ্মীর আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় কাশ্মীরকে পূর্ণ আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে রাখা হয়। রাখা হয় তাদের জন্য আলাদা জাতীয় পতাকা ও স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা। হঠাৎ রাতের অন্ধকারে কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। কাশ্মীরের স্বতন্ত্র মর্যাদা লুপ্ত করা হয়। একে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় কাশ্মীরিদের স্বাধীনতার অধিকার। স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরিদের অব্যাহত চেষ্টায় ক্রমেই যখন কাশ্মীরের স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, তখনই তাদের দেওয়া হয় ‘জঙ্গি’ তকমা। ব্যস, কেল্লা ফতে। দখলদার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই ‘জঙ্গি’। একে একে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভুলে যায়, এদের স্বাধীন ভূমি ছিল। তারা ভুলে যায়, যাদের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিরা সংগ্রাম করছে তারা দখলদার। যেহেতু কাশ্মীরিরা জঙ্গি, তাই তাদের নিধনের আর কোনো বাধা নেই! এখানেও ‘জঙ্গি’ শব্দের নিচে চাপা পড়ে যায় কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা ও অধিকারের কথা। রোহিঙ্গা বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বড় সমস্যা। তারা আরাকানে (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ) হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে। বর্বর বার্মিজরা ক্রমেই আরাকানিদের সুযোগ-সুবিধার পথ সংকুচিত করতে থাকে। সর্বশেষ ১৯৮২ সালে তথাকথিত নিউ সিটিজেনশিপ ল বা নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়। নিজেদের হাজার বছরের আবাসভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়ে রোহিঙ্গারা। তারা যখনই তাদের মৌলিক অধিকারের দাবি তোলে, তখনই তাদের ওপর নেমে আসে আইয়ামে জাহেলিয়াতকে হার মানানো নির্যাতন। এর বিরুদ্ধে কথা বললেই জোটে ‘জঙ্গি’ তকমা। এ বিষয়ে ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ কালের কণ্ঠে একটি বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সেটি ছিল ওই দিনের কালের কণ্ঠের লিড নিউজ। নিউজটির শিরোনাম হলো—‘সন্ত্রাস দমনের নামে রাখাইনে গণহত্যা!’ প্রতিবেদনটির সূচনা হয়েছে এভাবে—“বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা’র কথা তোলার ঘোষণা দিচ্ছে, তখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’র (এআরএসএ বা আরসা) হামলার আশঙ্কার তথ্য প্রচার করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী আরসার সদস্যসংখ্যা মাত্র ৫০০। ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযানের নামে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সোয়া এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে ভিটেমাটিছাড়া করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে মিয়ানমার। ” সংবাদপত্রের রুলস অনুযায়ী কোনো অপরাধ আদালত কর্তৃক সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ওই অপরাধে বিশেষিত করা যায় না। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মিডিয়া অনায়াসেই মুসলমানদের ‘জঙ্গি’ বলতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো সাবধানতা অবলম্বনের প্রয়োজন তারা বোধ করে না। অথচ হাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে মুসলমানদের জবাই করে হিংস্র বৌদ্ধরা যে রক্ত-উৎসবে মেতে ওঠে, এর হাজারো প্রমাণ থাকলেও বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের ধর্মীয় সন্ত্রাসী বলা হয় না। অথচ মজলুম শান্তিকামী মুসলমানদের বলা হয় ‘জঙ্গি’। এতে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা আড়ালেই থেকে যায়। সেই ইতিহাসও ঢাকা পড়ে যায় যে মুসলমানরাই মানবাধিকারের বীজ বপন করেছে পরম যত্নে। প্রতিপক্ষ আক্রমণাত্মক হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ না করে সন্ধি কিংবা বিকল্প মাধ্যমে শান্তি চেয়েছে ইসলাম। যুদ্ধ লেগে গেলেও হত্যা এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর নীতি অবলম্বন করেছিলেন মহানবী (সা.)। ফলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সবগুলো যুদ্ধ মিলে শত্রু-মিত্রের প্রাণহানির সংখ্যা অনেক কম। কোনো ঐতিহাসিকের মতেই তা দুই হাজার ছাড়ায়নি। অথচ সভ্যতার দাবিদারদের দুটি বিশ্বযুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ৩৬ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। মনে হয়, আগামী দিনে হয়তো আমাদের অভিধানে সন্ত্রাস ও জঙ্গি শব্দের নতুন অর্থ লিখতে হবে। আমাদের দেশের কিছু মিডিয়ার কাছেও জঙ্গি শব্দটি একটি বড় পুঁজি। কারণে-অকারণে কাউকে জঙ্গি বা জিহাদি বলে চালিয়ে দিতে পারলেই তারা মহাখুশি। ইসলামী বই দেখলেই তাদের মনে হয় ‘জিহাদি বই’। দৈনিক জনকণ্ঠ ১৫-১০-২০১৫ ‘ফুটপাথে জিহাদী বইয়ের ছড়াছড়ি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বিখ্যাত আরবি ব্যাকরণের গ্রন্থ ‘শরহে মিআতে আমেল’ ও দোয়ার বই ‘হিসনুল মুসলিম’কে ‘জিহাদি বই’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। এটা কি অজ্ঞতা, নাকি ধৃষ্টতা? আরবি ব্যাকরণ ও দোয়ার বই যদি ‘জিহাদি বই’ হয়, তাহলে সরকারের অর্থে পরিচালিত সরকারি মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন আরবি ব্যাকরণ ও দোয়ার বই পড়ানো হয়? আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার, ইসলাম নিরপরাধ মানুষ হত্যা সমর্থন করে না। ইসলামের নামে কেউ অন্যায়ভাবে হত্যা করলে তার অবশ্যই বিচার হতে হবে। তবে নিরপরাধ মানুষ যেন আক্রান্ত না হয়, জঙ্গিবাদ নিয়ে যেন বাণিজ্য না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। জঙ্গি শব্দের অর্থ হলো যোদ্ধা। বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘জঙ্গ’ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে যুদ্ধ বা লড়াই। আর জঙ্গি শব্দের অর্থ হলো ‘রণনিপুণ’ বা ‘রণদক্ষ’। (বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা : ৪৪৮) আসলে ‘জঙ্গি’ বা ‘জিহাদি’ শব্দগুলো আজ সবচেয়ে মজলুম শব্দে পরিণত। মানবতাবিরোধী ইহুদি-খ্রিস্টান সন্ত্রাসীরা ‘জিহাদি’ বা ‘জঙ্গি’ শব্দগুলো যেভাবে ব্যবহার করছে, তা মুসলিম দেশ দখল ও মুসলিম নির্যাতন বৈধ করার হাতিয়ার। আমাদের দেশের কেউ কেউ যত্রতত্র ‘জঙ্গি’ শব্দের ব্যবহার করতে অতিউৎসাহী। অথচ একসময় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শব্দ ছিল ‘জঙ্গি’! মুক্তিযুক্তের ইতিহাস পুনর্পাঠ করলে এ বিষয়ে বিশদ তথ্য মিলবে। আমি শুধু জাহানারা ইমামের দ্বারস্থ হচ্ছি। তিনি তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে লিখেছেন, ‘শেখ মুজিব প্রতিদিন প্রেসিডেন্ট ভবনে যাচ্ছেন আলোচনা করতে, বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বলছেন আলোচনা এগোচ্ছে; ওদিকে আন্দোলনকারী জঙ্গী জনতাকে বলছেন দাবি আদায়ের জন্য আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যান। ’
শেয়ার করুন